Bengali BlogTravel Blog

ইম্ফাল ভ্রমন-জীবন থেকে শেখা

ভারত মাতার মানচিত্রের এপার-ওপার প্রদক্ষিণ করেছি অনেক বার। অনেক শহর ঘুরেছি দেখেছি অজানাকে। প্লান করলাম ইম্ফাল যাব । ইম্ফাল সম্পর্কে একটু বলি, ইম্ফাল মনিপুর অঙ্গরাজ্যের রাজধানী । বেশ বড়ই । ইম্ফাল এ দেখার মত আছে কিনা তাও চেক না করেই প্লান করে নিলাম।


কলকাতা থেকে ইম্ফাল এর টিকেট কাটলাম ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স এ। খুলনা হয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে কলকাতা ইমিগ্রেশন এ । ইমিগ্রেশন এ জিজ্ঞেস করল কোথায় যাব,কেন যাব। আমার সাদা মনে কোন কাদা নাই, সোজা বলে দিলাম ইম্ফাল যাব। বিপত্তি এখানেই!
ইমিগ্রেশন অফিসার চোখ বড় করে বল্ল “ইম্ফাল কেন? কি করতে যাবেন?” ভাবখানা এমন যে কয়েদি ধরে ফেলেছে।এরপর বললাম ঘুরতে  যাচ্ছি স্যার। উত্তরে আমাকে বললেন “ ইম্ফাল কেন? গোটা ভারতে ত অনেক জায়গা আছে”।
আমি বললাম অনেক ঘুরেছি স্যার, এবার একটু অন্যরকম জায়গায় যাই। তিনি বললেন, আচ্ছা যান তবে একটু সাবধানে থাকবেন ইম্ফাল খুবই বাজে জায়গা,  মাওবাদি নামক সন্ত্রাসি সংগঠন আছে ওখানে। তাকে বললাম সতর্কতার জন্য ধন্যবাদ স্যার।

ইমিগ্রেশন পার হয়ে ওপারে গিয়ে টাকা ভাঙ্গিয়ে চলে গেলাম বাস কাউন্টারে বাসে করে এয়ারপোর্ট যাবার উদ্দ্যেশ্যে। আমি বেশ এক্সাইটেড। বাসে করে এয়ারপোর্ট এসে কাছেই একটা হোটেলে উঠলাম। নাম বলব না, বললে ভাব্বেন আমি তাদের মারকেটিং করছি😂।

যাইহোক, খুব সকালে ফ্লাইট। সকালে উঠে এয়ারপোর্টে গিয়ে ইম্ফাল এর বোরডিং নিয়ে প্লেনে উঠে ইম্ফাল আসলাম ১০ টা বাজে। বিদেশিদের জন্য ইম্ফাল এয়ারপোর্টে আলাদা লাইন। ইমিগ্রেশন টাইপের কিছু। পাসপোর্ট এ সিল দিল। খুবই আন্তরিক একজন ইমিগ্রেশন অফিসার। বিপত্তি হল আমি হোটেল বুক করে নিয়ে যাই নি। আমাকে ত যেতেই দিবে না এয়ারপোর্টের বাইরে🙄।যাইহোক, কোন মতে চাপার জোরে বের হলাম।

আমার উদ্দ্যেশ্য ইম্ফাল থেকেও ৬০  কিলোমিটার দূরে চুরাচান্দপুর। এই জায়গার নাম কেউ শুনেছেন বলে আমার মনে হয় না। আমার এক বন্ধু আছে এখানে। ভাবলাম ওর কাছ থেকে ঢু মেরে যাই। এয়ারপোর্ট থেকেই গাড়ি ভারা করলাম। ২ ঘন্টার রাস্তা। বেশ ভাল ডিল। গাড়ি ছাড়ল। যতই সামনে আগাচ্ছি মনে হচ্ছে গ্রামের দিকে আগাচ্ছি😐। যদিও রাস্তার পাশের দিকটা বেশ সুন্দর ও সবুজ ছিল

রাস্তার দুই ধারে মানুষের থেকে ইন্ডিয়ান আর্মি বেশি দেখলাম। পরে জানতে পারলাম এই জায়গা মিলিটারি ক্যাম্পিং ও মাওবাদি(ভারতিয় এক জঙ্গি সংগঠন)দমন ক্যাম্প হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। মনে একটা ভয় ঢুকল।

ভারতীয় আর্মি

যাইহোক, এসে পৌছালাম চুরাচান্দপুর। হায়হায় কোন হোটেল নাই থাকার মত🤔। ইন্টারনেট দেখি ২জি ও নাই। আর আমার একদিনও ইন্টারনেট ছাড়া চলে না। বেশ বিপদে পড়ে গেছি। বন্ধুর বাসায় উঠলাম। তার বাসা ছোট্ট। আমার কোন সমস্যা হল না। বিদ্যুৎ আসে আর যায়। এটা ভারতের সব থেকে খারাপ জায়গাও বলা যায়। যাইহোক, লম্বা ঘুম দিয়ে উঠলাম। প্লান কিছুই না। মনিপুর,ইম্ফাল,সেভেন সিস্টার্স প্রদেশ এই শব্দগুলো অনেক শুনেছি তাই একটা এক্সাইট্মেন্ট কাজ ত করেই। ঘুম থেকে উঠলাম সকালেই। ৭ টা বাজে হয়ত। বাইরে বের হলাম সকালের নাস্তা করতে। হায় হায় দোকানই ত খুলে নাই! আর রেস্টুরেন্ট বা খাবার হোটেল এর কোন খোজ খবর পাচ্ছি না। প্রায় ৩০ মিনিট হাটার পর একটা ছোট্ট রেস্টুরেন্ট পেলাম কেবল খুলেছে,

তারা আবার ১০ টার আগে কিছুই করবে না তাও আবার ডিম ভাজির বেশি কিছু হবে না ,কি একটা অবস্থা!

কি বা করার আছে? বসে রইলাম এক কাপ চা আর মাসালা অমলেট এর জন্য। আমার খাওয়া সব থেকে বাজে অমলেট। খেয়ে বন্ধুর বাসায় গিয়ে দেখি বন্ধু ঘুমায়। আমার মতই আলসে। বললাম ঘুরতে বের হব চল। আজকে ব্যাস্ততম জায়গা গুলো দেখব এরপর বাকিসব। কোন তাড়া নেই। বের হলাম একটা টুকটুক নিয়ে( আমরা যেটাকে অটোরিকশা বলি )। বাইরে প্রচুর ধুল আর গরম। আমি ঢাকায় প্রায় সময় থাকি তারপরও আমার মনে হল এই জায়গা ঢাকার থেকেও বেশি নোংরা!  

আমার টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় গেলাম ডলার ভাঙ্গাতে। গিয়েই খেলাম বড় এক ধাক্কা। ডলারের পরিবর্তে যেখানে ৬০+ রুপি অনায়াসে পাওয়া যায় এখানে পাওয়া যাবে ৪০-৪৫ রুপি। কিচ্ছু করার নেই একটি মাত্র এক্সচেঞ্জ শপ।

টাকা নিয়ে গেলাম পাহাড় দেখতে। ইম্ফাল মনিপুর অংশের সব থেকে সুন্দর অঞ্চল বল্লেও ভুল হবে না।


ইম্ফাল

আরো ছবি দেখতে চলে যান এই লিঙ্কে
সারাদিন ঘুরে ফিরে প্রকৃতির সাথে হেসে খেলে চুরাচান্দপুর ঢোকার সাথে সাথেই মনে হচ্ছে দুষন আর ধুলা আমাকে মেরে ফেলবে। জলদি গিয়ে মুখের পরিধান করার মাস্ক কিনে আনলাম। পাহাড়ে ঘেরা অনেক অঞ্চল ঘুরেছি ভুটান,নেপাল ,ভারতের কত জায়গা, পাহাড়ের আশে পাশে  থাকা মানেই দুষনমুক্ত হবার কথা হলেও এখানের পরিস্থিতি তার ঠিক উল্টো।

ঘরে এসে ঘুম দিলাম। রাত ১ টার পর তুখোড় ঠান্ডা। আমি ত মরে যাই অবস্থা। পরে কম্বল গায়ে জড়িয়ে আবার ঘুম দিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে সেই ডিম ভাজা আর চা খেয়ে হোটেল খুজার কাজে লেগে গেলাম আর বন্ধুর থেকে বিদায় নিলাম। অনেক কস্টে একটু দূরে হোটেল পেলাম। ৯০০ রুপি পার ডে। আমি ত হেব্বি খুশি। এর মধ্যে আমার আমেরিকান বন্ধু এসে আমার সাথে মিলিত হল। যিনি পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই গিয়েছেন।

আমার পিছনেই ঐ ঘরের মত দেখতে আমার হোটেল। হোটেল বললে ভুল হবে, এটা একটা হোম স্টে, মানে কোন পারিবারিক ঘরে টাকা দিয়ে থাকা।

বন্ধুকে পেয়ে আমি অনেক খুশি হলেও তার জায়গাটা তেমন পছন্দ হয় নি। যাইহোক, ৩য় দিন এর শুরু হল, আমার বন্ধু বল্ল এখানে ত সবই গ্রাম, চলো আরো গ্রামের মধ্যে যাই। বললাম নাইস আইডিয়া।
একটা অটো রিকশা ভাড়া করে গেলাম গ্রামের দিকে। আহা! মানুষের জিবন এখানে যেন বড্ড কস্টের। নোংরা, দূষিত বাতাস আর হাসিমুখ এই তিন জিনিস চোখে পড়ল যতদূর গেলাম। গ্রাম ঘুরে খারাপ ও ভাল দুটোই লাগল। খারাপ লাগল জিবন যাত্রার মান দেখে, আর ভাল লাগল নিজের জন্য যে বাংলাদেশে ত অনেক ভালই আছি। এই ট্রিপ থেকে বুঝেছি কেন ভারতের মত সুন্দর গণতান্ত্রিক দেশেও  মাওবাদী ও পাহাড়ী আতঙ্কবাদী দল সংগঠিত হয়। নিজেদের অধিকার আদায় না হলে সবাই আন্দোলন করতে চায়। কেউ পায় যোদ্ধার খেতাব আর কেউ সন্ত্রাসীর।


যাইহোক, ইম্ফালে গরম-ঠান্ডা/গরম-ঠান্ডা আবহাওয়ায় আমার অবস্থা খারাপ। গায়ে উঠল ১০২ ডিগ্রি জ্বর। আমার বন্ধু ও যেই বাসায় আছি তারা বেশ চিন্তিত। আশে পাশে হাসপাতাল বলতে কয়েকটা বড় ফারমেসি আছে এই যা। পাশের ফারমেসি থেকে জ্বর ও সর্দির ওষুধ এনে খেলাম।

২ দিন অসুস্থ বেডেই শুয়ে ছিলাম।
এর মধ্যে একটি রেস্টুরেন্ট এর খবর পেলাম যারা নাকি এই জায়গার মধ্যে সেরা। কিন্তু খেতে যেতে হবে ১৩ কিলোমিটার দূরে গিয়ে । আমি আমার বন্ধুকে বললাম আমাকে নিয়ে চলো অনেকদিন হল পেট-পুরে কিছু খাই না। গিয়ে দেখি জীর্ণ শীর্ণ দোকানের অবস্থা। তবে খাবার খেয়ে বুঝলাম কেন এটাকে সেরা বলা হয়েছিল। খুবই মজার ও সুস্বাদু।

আমি সুস্থ হলেই প্লান করি ইম্ফাল শহরে যাবার। গাড়ি ভাড়া করে দিল আমাদের হোস্ট। তাকে ৪ দিনের টাকা বুঝিয়ে দিলাম। খুব খুশি কারন এরকম গেস্ট সে সচারচর পায় না। তাদের সাথে খুব ভাল সময় কেটেছে এই কয়দিন । অনেক গল্প আর ইম্ফাল সম্পর্কে ইতিহাস ও বাস্তবতা জেনেছি। জিবনে যদি আবার ঐখানে যাই তবে তাদের জন্য যাওয়া হবে।

ছবিতে মাস্ক পড়া ঐ ছেলেটা আমি।

ছবির এই গাড়িতে করে চলে এলাম ইম্ফাল মেইন  শহরে।

ইম্ফাল শহর বেশ পরিপাটি। বাতাসও মনে হচ্ছে একটু ভাল। মাস্ক পড়ার কোন দরকার ছিল না। হোটেলে এসে পৌছালাম। বেশ আলি-শান টাইপের। ক্লাসিক ব্রান্ডের হোটেল।

রুম বেশ পছন্দ হয়েছে। ব্যাগ রেখে বের হলাম ঘুরতে। মেইন শহরে দেখার মত তেমন কিছু না থাকলেও এক্সপ্লোর করার অনেক   জায়গা আছে । প্রথমেই চলে গেলাম লোকতাক লেক দেখতে। ভারি সুন্দর লেগেছে আমার কাছে। নেপালের ফেওয়ালেক দেখার আগে এটাই আমার পছন্দের লেক ছিল।


Photo credit: Lostwithpurpose.com

লেকে খুবই মনরম পরিবেশে কিন্তু নৌকা ভাড়া ৫ গুন বেশি নেয় স্বাভাবিক এর থেকে। সারাদিন ঘুরে একটি মুসলিম হোটেলে বিরিয়ানি খেলাম। মালিক আসামের বাসিন্দা যিনি  বছর বিশেক আগে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। আমাকে পেয়ে ঈদের মত খুশি হলেন। খাবার খেয়ে রুমে এসে রাতটা কাটিয়ে দিলাম হোটেলে। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। আমাদের হোটেলের এরিয়া বিশাল। বাগানের দিকে এক চক্কর মেরে রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বের হলাম শহরের দিকে।

জ্যাম তেমন নেই, প্রধান রাস্তার মোড় তাও ফাকা। আহা, ঢাকা যদি এমন হত ভাবতে ভাবতে শহরের বিভিন্ন ট্যুরিস্ট এট্রাকশন এ ঘুরলাম। ইম্ফাল যদি সত্যি কেউ যেতে চান তাহলে ইমা কাইথেই বা মাদারস মারকেট ঘুরতে যাবেন। এই মার্কেট ১০০% নাড়ীদের দ্বারা পরিচালিত এবং এশিয়ার বৃহত্তম ইউমেন্স মারকেট –

আরো জানতে ঘুরে আসুন এই লিংক

কাংলা দুর্গ, মাতাই গার্ডেন আর ওদের শহিদ মিনার ঘুরতে ঘুরতে বিকাল ৬টা। হোটেলে আসলাম ক্লান্ত হয়ে।  একটু পরেই হোটেল রুমে হোটেলের একজন স্টাফ এসে বল্ল স্যার আজকে ইম্ফালের বিখ্যাত স্ট্রিট ফুড কার্নিভাল হবে এবং আমাদের হোটেল এই বছরের অনুষ্ঠান হোস্ট করবে। আমি ত মহা খুশি। ভারতীয় স্ট্রিট ফুডের উপর আমার অনেক আগের ভালবাসা। অনুষ্ঠানে পেটপুরে খেলাম । ট্রাই করলাম প্রায় সব ধরনের খাবার। বেশ অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।

রাত ১০ টায় কার্নিভাল শেষ হল সাথে আমার খাওয়াও। রুমে গিয়ে সোজা ঘুমাতে গেলাম। কালকে খুব ভোরে আমার ফ্লাইট গুয়াহাটি হয়ে গোয়া এর উদ্দ্যেশ্যে ।
ইম্ফাল ট্রিপ শেষ হল। এই ট্রিপ আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে নিজের স্বাছন্দ্যের জায়গা থেকে বের হয়ে কিছুদিন টিকে থাকতে হয়। এই ট্রিপ আমাকে নিজের জিবনে কতটা পেয়েছি এবং আমার থেকেও যে দুঃখী মানুষ দুনিয়ায় আছে সেটা চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।

ধন্যবাদ পুরোটা পড়ার জন্য।



Related posts
Bengali BlogTravel Blog

নাগাল্যান্ড ভ্রমনের আদ্যপান্ত।

English BlogTravel Blog

Trip to Delhi>Agra>Jaipur Triangle.

Bengali BlogTravel Blog

১০০ ডলারে থাইল্যান্ড ভ্রমন---বাজেট ট্রাভেল প্লান.

Bengali BlogTravel Blog

সিলেট--কম খরচে ৩৬০ আউলিয়ার দেশ ভ্রমন সমাচার

Sign up for our Newsletter and
stay informed

4 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares