Bengali BlogTravel Blog

নেপাল ভ্রমন ৫ম পর্ব(পোখারা শহর,সারাংকোট,ফেওয়ালেক)

ঘুম থেকে উঠলাম। তখন ঘড়ির কাটায় বাজে ৪ টা। বন্ধুর বাসা পাহাড়ের বিশাল উপরে। বাইরে ভিষন ঠান্ডা। বাথুরুমে গিয়ে গরম পানি পেয়ে মহা খুশি। ফ্রেশ হয়েই নেমে পড়লাম বাইরে। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশেপাশে কেউ নেই। হু কেয়ারস। উঠা শুরু করলাম সারাংকোট এর সূর্যদয় দেখতে।

আমার হোম স্টে এর পাশের সিড়ি দিয়েই উপরে উঠার রাস্তা। এত সকালে অবশ্যই আপনি আপনার হোস্ট এর থেকে চা আশা করবেন না ,আমিও করি নি কিন্ত তারা আমাকে এক কাপ গরম চা আর বিস্কুট খেতে দেয়। চা টা মুখ্য ছিল না ওটা যে গরম সেটাই অনেক কিছু। চা খেয়ে সরি চা পান করে উঠা শুরু করলাম উপরের দিকে। এতটাও কাছে না। উঠতে সময় লাগল ১৫ মিনিট। কেউ নেই আমি ছাড়া। যদিও অনেকেই এসে পড়েছিল ১৫-২০ মিনিটের মধ্যে। এখনো অন্ধকার। একটু পরেই আলো আসতে শুরু করল। ধিরে ধিরে স্পস্ট হচ্ছে অন্নপূর্ণা মাউন্টেন । দেখতে বেশ লাগে। ৬ টার পরেও যারা আসেন তারাও কিন্তু এত ভালভাবে দেখতে পারেন না। অনেক মানুষ ৬ টার পরে এসেও “ওয়াও” রিয়্যাকশন দিচ্ছিল তারা আসলে সৌন্দর্যের ৮০% দেখতেই পারে না। আমার ব্লগ যারা পড়ছেন তারা যদি সারাংকোট যান তাহলে ৫ টার মধ্যেই চলে যাবেন। সারাংকোট এর ভিউ পয়েন্ট এ গেলে ৫০ নেপালি রুপি লাগে। সূর্যদয় দেখার ব্যাপারটা আসলে ব্লগে লিখে বুঝানো যায় না।

৮ টার দিকে চলে এলাম রুমে। এসে বসার সাথে সাথেই দেখি ব্রেক ফাস্ট রেডি! রুটি,জ্যাম আর মধু। আমাকে আমার বন্ধুর মা বল্ল মধু খেলে গা গরম হয়, খেয়ে নাও এই ঠাণ্ডায় ভাল লাগবে। উপদেশটা ভাল লেগেছে। কারন তখন তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি। বন্ধুর বাবা আবার ফায়ার ক্যাম্পিং এর ব্যবস্থা করে দিল আমাদের জন্য, পুরাই ফেমিলি ওয়েদার। ব্রেকফাস্ট শেষ করে বের হলাম পাহাড় দেখতে। একটু হেটে গেলেই স্কাই ডাইভিং স্পট।আমি স্কাই ডাইভিং করিনি যদিও দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছি অনেক সময়। দেখে ত ভয়ই লাগছিল তবে স্কাই ডাইভিং শেষে সবার চেহারা দেখে মনে হল বেশ আনন্দই পেয়েছে।

সারাংকোট থেকে পোখারা যেতে ১৫০০-২০০০ নেপালি রুপি লাগে। কিন্তু একটা চোরা বুদ্ধি আছে। স্কাই ডাইভিং করতে পর্যটকদের নিয়ে যে মাইক্রোগুলো আসে, ওদের সাথেই আবার পোখারা শহরে যাওয়া যায়। ২০০ নেপালি রুপিতেই। আসার সময়েও ওদের সাথেই আসা যায় তবে একটু খুজে দেখতে হয়।
আমি পায়ে হেটেই রওনা দিলাম পোখারা শহরের দিকে। একটা সাইনবোর্ড এ দেখলাম পোখারা যাবার দিক ও দুরুত্ব দেখাচ্ছে। এই বেশ কাছেই। পাহাড়ি পথে সিড়ি বেয়ে নামতে হয়। পাহাড়ি ভিউ দেখছি আর নামছি। বেশ উপভোগ্য। ১২ টার দিকে পোখারাতে প্রচন্ড গরম এই জানুয়ারি মাসেও যেটা কিনা নেপালের সব থেকে ঠাণ্ডা মাস। কিন্তু দুপুরের কয়েক ঘন্টা নেপাল রুপ বদলে ফেলে কিভাবে যেন।

যাইহোক, বিশাল কোর্ট পড়া আমি গরমে শেষ। পাহাড়ি রাস্তা শেষই হয় না। যত হাঁটছি ততই গেস্ট হাউজ আর রেস্টুরেন্ট চোখে পড়ছে। একটা ক্যাফেতে থামলাম ।ক্লান্ত এবং তৃষ্ণার্ত । ঠাণ্ডা পানি ও মোমো নিলাম খেতে। খাওয়া শেষে আবার হাটা। সারাংকোট খুব উচুতে অবস্থিত সেই বিবেচনায় পোখারা মেইন শহর কিছুটা নিচুতে। সিড়ি দিয়ে নিচে নামতে মোটেও কস্ট হয় নি বলা যায়। ১৫ কিলোমিটার হেটে চলে এলাম পোখারাতে। ৩ টার মত বাজে। পোখারা শহর কাঠমান্ডুর মত নয়। কাঠমান্ডু নোংরা,দুষিত এবং গ্যাদারিং। সেদিক থেকে পোখারা অনেকটাই পরিকল্পিত। প্রথমেই খুজলাম বিরিয়ানি পাওয়া যায় এমন রেস্তোরা। পেয়েও গেলাম একটা ভারতিয় রেস্টুরেন্ট। মজা করে খেয়ে আবার সারাংকোট এর দিকে রওনা দিলাম। পথ ত চিনিই।

তবে আমার মত ভুলটা কখনোই করবেন না। পাহাড়ি পথে উপর থেকে নিচে নামা এতটাও কস্টকর না হলেও নিচ থেকে উপরে উঠা প্রায় অসম্ভব। তাও আবার ১৫ কিলোমিটার। আমি ভুটানের টাইগার নেস্টের চুড়ায় উঠেছিলাম তাই অভিজ্ঞতা আছে কিছুটা । নতুন কেউ হলে আর সাথে পানি না থাকলে পাহড়ে ক্লাইম্ভ করার চিন্তা মোটেও মাথায় আনবেন না। ত উঠার সময় অনেকটা নাকানি চুবানি খাই সাথে আবার ৫ টার মধ্যে সন্ধ্যা চলে আসে। সন্ধার পর অন্ধকার । নেপাল অনেকটাই নিরাপদ তবে পাহাড়কে বিশ্বাস করা ঠিক না। মহা বিপদে পরে গেলাম । গুগল ম্যাপে দেখলাম এখনো ৯-১০ কিলোমিটার কিন্তু সন্ধ্যা নেমে গেছে। পরে বন্ধুকে ফোন করে বললাম, সে তার জিপ নিয়ে চলে এল। এক বাচা বেচেছি। রুমে এসে হালকা নাস্তা করলাম। এরপর একটা লম্বা ঘুম। অনেক ক্লান্ত। ঘুম থেকে উঠলাম রাত ১০ টার দিকে। রুমের বাইরের টেবিলে আমার জন্য রাখা রাতের খাবার খুব সুন্দর করে ঢেকে রাখা সাথে এক বোতল পানি। খেয়ে দেয়ে কিছুক্ষন গান শুনে ঘুম দিলাম। কালকে সকালে অনেক প্লান তবে খুব ভোরে উঠার কোন তারাহুরো নেই।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলাম। বন্ধুর বাসায় দুইদিন ছিলাম। আজকে বিদায় নেবার পালা। একজন নেপালি এর মত থেকেছি,খেয়েছি ও ঘুরেছি। এবার বিদায় নিতে হবে। বন্ধুর জিপে চলে এলাম পোখারা শহরে।

http://www.booking.com থেকে হোটেল বুক করে নিলাম। যাদের ক্রেডিট কার্ড নেই তারাও কিন্তু এই ওয়েবসাইট থেকে হোটেল রিসারভেশন করতে পারে। আমি হোস্টেলে উঠলাম, পোখারা এর বিখ্যাত ফেওয়া লেকের পাশেই। হেটে যেতে অল্প সময় লাগে। ৬ বেডের একটি রুম সিলেক্ট করলাম। ভাড়া ৬০০ নেপালি রুপি। হোস্টেলের ভিতরের পরিবেশটা আমার কাছে দারুন লেগেছে। ক্যাম্পিং করার জায়গা, আড্ডা দেওয়ার জন্য সিট করা আরো কত কি। হোস্টেলে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে পোখারা শহরটাকে ভাল করে ঘুরে নিলাম। আমি হাটতে পছন্দ করি তাই যেকোন ট্রিপে আমার যানবহন ব্যয় অনেক কম হয়। এটা একটা প্লাস পয়েন্ট বলতে পারেন।
যাইহোক, সেদিন আর তেমন কিছু করলাম না। ঘুরলাম, খেলাম আর হালকা শপিং। রাতে হোটেলে গিয়ে সবার সাথে হই হুল্লুর।

পরেরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ভাবলাম এক্সট্রিম এক্সপ্লোর হবে, কিন্তু কিসের কি। শুরু হল বৃষ্টি । থেমে থেমে চলল দুইদিন। এমনিতেই নেপালি ঠান্ডায় আমি শেষ, তার উপর বৃষ্টিতে বের হলে আমার অবস্থা আরো খারাপ হবে কোথাও বের হই নি। হোস্টেলের ভিতরে খাওয়া দাওয়া ঘুম আর মুভি দেখা সব বন্ধুদের নিয়ে। একেবারে খারাপ যায় নি সময়টা। তবু পাখি খাচায় ভাল থাকে না।
২দিন পর আবহাওয়া ভাল হলে বের হলাম ঘুরতে একদম সকাল সকাল। পোখারার সকালটা বেশ উপভোগ্য। বাইরে প্রচন্ড শীত। হয়ত ২-৩ ডিগ্রি হবে। আমার আপাদমস্তক ঢেকে বের হলাম। চলে গেলাম ডেভিস ফলস এ । এটি একটা প্রাকৃতিক ঝর্না । ভালই লাগছিল তবে আহামরি কিছু নেই। আমাদের দেশের ঝর্না বা ভারত ভুটানে আমার দেখা ঝর্না গুলোর মতই। কিছু সময় থেকে চলে এলাম। একটা জিনিস অনুধাবন করেছি যে দেশের বাইরের সবাই নিজেদের যেভাবে প্রোমোট করে আমরা এটা মোটেও করতে পারি না।
এরপর চলে গেলাম সেই বিখ্যাত ফেওয়া লেকে। এই ফেওয়া লেকে নৌকা ভ্রমনের জন্যেই মুলত আমার পোখারা আসার এত আগ্রহ ছিল। পরিবেশটা শান্ত এবং মানুষ ও কম আজকে।

বোটিং করার অনেক প্যাকেজ আছে। আমি এক ঘন্টার একটা প্যাকেজ নিলাম।

পাশেই টিকেটিং কাউন্টার আছে টিকেট কাটার জন্য। আপনি গিয়ে বললেই দিয়ে দিবে। টিকেট কেটে কাউন্টার এর পিছনে স্লিপ নিয়ে গেলে একটি লাইফ জ্যাকেট দিবে যেটি আপনাকে কোন দুর্ঘটনায় ডুবে যাবার হাত থেকে বাচাবে। অনেকেই দালালদের চক্করে পড়ে লাইফ জ্যাকেট ভাড়া নেয়, এটা করার কোন প্রয়োজন নেই। যত অল্প টাকার টিকেটই কেনেন না কেন লাইফ জ্যাকেট ওরা ফ্রি ই দিবে। যাইহোক, নৌকায় গিয়ে বসলাম। ছোট একটি ছেলে আমার নৌকার মাঝি। ও কে পটিয়ে নিলাম আর এনাম দেবার কথা বললাম বদলে আকর্ষণীয় পয়েন্টগুলো ও সময় নিয়ে সবটা দেখাতে হবে। সে রাজি হয়ে গেল। পুরো যাত্রাটি নিয়ে আমার একটি ভিডিও আছে চাইলে দেখে নিতে পারেন এইখানে —


ফেওয়া লেকে বোটিং করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারন ছিল। আমি এর আগে কাশ্মিরের বিখ্যাত ডাল লেকেও বোটিং করেছি তবে ফেওয়া লেকের মধ্যে স্বর্গীয় সুখ ছিল।
খাবার খেয়ে পোখারা শহরটাকে আরেকবার ঘুরে নিলাম। কে জানে আবার কবে আসব বা আদৌ আসা হবে কিনা। পরশু আমার ফাইট দিল্লির জন্য। দিল্লিতে প্যারেড দেখতে যাব ওদের প্রজাতন্ত্র দিবসের জন্য। এরপর বাড়ির পথে যাত্রা, একটা লম্বা ট্যুর ছিল। প্রত্যেকটা সেকেন্ড উপভোগ করেছি নেপালের। মানুষগুলো বেশ মিশুক। কেন জানি বাংলাদেশিদের ওরা অনেক বেশি সন্মান করে। আশা করছি আমাদের দেশ থেকে পর্যটকরা নেপালে আমাদের ইমেজটা ধরে রাখবেন।

যেখানেই ঘুরতে যান, পরিবেশ পরিষ্কার পরিছন্ন রাখুন।
অন্য কোন দেশ বা জনপদ নিয়ে লিখব হয়ত কোন একদিন।
ভাল থাকবেন।

Related posts
Bengali Blog

ইথিওপিয়া - প্রাচীনতম মানুষের দেশ.

Bengali BlogTravel Blog

পার্টি সিটি গোয়া ভ্রমন

Bengali BlogTravel Blog

নাগাল্যান্ড ভ্রমনের আদ্যপান্ত।

English BlogTravel Blog

Trip to Delhi>Agra>Jaipur Triangle.

Sign up for our Newsletter and
stay informed

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Worth reading...
গরিবের নেপাল ভ্রমন (পর্ব ৩)।
Shares